প্রাকৃতিক
সৌন্দর্যের বিস্ময়কর নিদর্শন হ্রদ বা লেক। লেক ডোবা, পরিখা, জলাশয় ইত্যাদি।
কিন্তু ‘লেক’-এর বাস্তব পরিচয় এর চেয়েও বেশি কিছু। লেক, পুকুর, ডোবা
ইত্যাদির মতো ছোট জলাশয় নয়; অনেক ক্ষেত্রে তা নদীর চেয়েও বিশাল। তবে হ্রদ
বা লেকের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা নদীর মতো প্রবাহিত হয়ে অন্য নদী বা
সাগরের সাথে মেশে না। লেক হলো আবদ্ধ জলাশয়। কোনো কোনো লেকের দৈর্ঘ্য,
প্রস্থ এবং গভীরতা এতো বেশি যে তা দেখে রীতিমতো ভিমরি খাওয়ার অবস্থা হয়।
অনেক হ্রদ আবার আয়তন ও গভীরতায় ছোট। কিছু হ্রদ মানুষের তৈরি। মানুষ নানা
প্রয়োজনে মাটি কেটে নেয়ার ফলে সৃষ্ট জলাশয় এগুলো। আবার কিছু জলাশয়
প্রাকৃতিক ভূগর্ভে প্রচণ্ড কম্পন বা আলোড়নের ফলে যে বিশাল বিশাল ফাটল
সৃষ্টি হয় তা থেকে এগুলোর উত্পত্তি। আমাদের বাংলাদেশেও ছোট-বড় বেশ কিছু
হ্রদ বা লেক রয়েছে। এগুলোর অধিকাংশই মানুষের সৃষ্টি। বাংলাদেশের লেকগুলোর
মধ্যে আছে বান্দরবানের বগা লেক, চট্টগ্রামের ফয়স’ লেক, রাঙ্গামাটির কাপ্তাই
লেক, মৌলভীবাজারের মাধবপুর লেক, নেত্রকোনার চুনাপাথর লেক এবং ঢাকার রমনা
লেক, সংসদ ভবন লেক, ধানমন্ডি লেক ইত্যাদি। লেকগুলোর অপরূপ সৌন্দর্য মানুষের
মন কাড়ে। তাইতো মানুষ দলে দলে ছুটে যায় সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে। বিনোদনের
কেন্দ্র হিসেবে এগুলো দর্শনার্থী ও দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড়ে সরগরম থাকে
সারাবছর।
পৃথিবীর
বিভিন্ন দেশে অনেক হ্রদ বা লেক রয়েছে। আজ আমরা রাশিয়ার বৈকাল হ্রদ সম্পর্কে
কিছু জানবো। বৈকাল হ্রদ রাশিয়ার সর্ব-উত্তরের অঞ্চল সাইবেরিয়ার দক্ষিণে
প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এবং পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন হ্রদ। এটির চারদিক
পাহাড় ঘেরা। ধারণা করা হয়, ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন বছর আগে ‘বৈকাল ফাটল এলাকা’র
ভূগর্ভে তীব্র আলোড়নের ফলে ভূপৃষ্ঠে একপ্রকার ফাটলের সৃষ্টি হয়; আর তারই
ফলে এই বিশাল জলাশয়— বৈকাল হ্রদের সৃষ্টি। আয়তনের মতো গভীরতার বিচারেও এটি
পৃথিবীর সর্ববৃহত্ হ্রদ। ৫ লাখ ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার বা ২ লাখ ১৬ হাজার
বর্গমাইল এলাকা জুড়ে এর অবস্থান। এই হ্রদ লম্বায় ৬৩৬ কিলোমিটার বা ৩৯৫
মাইল; চওড়ায় সর্বোচ্চ ৭৯ কিলোমিটার বা ৪৯ মাইল। এর গড় গভীরতা ৭৪৪.৪ মিটার
বা ২ হাজার ৪৪২ ফুট; আর সর্বোচ্চ গভীরতা ১ হাজার ৪৪২ মিটার বা ৫ হাজার ৩৮৭
ফুট। সৈকত বা বেলাভূমির দৈর্ঘ্য ২ হাজার ১০০ কিলোমিটার (১ হাজার ৩০০ মাইল)।
বৈকাল হ্রদ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ১৮৬.৫ মিটার বা ৩ হাজার ৮৯৩ ফুট
নিচে। এই হ্রদে রয়েছে ছোট-বড় ২৭টি দ্বীপ। সবচেয়ে বড় দ্বীপটির নাম ওলখন, যা
লম্বায় ৭২ কিলোমিটার। বৈকাল হ্রদ পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহত্ স্বচ্ছ পানির
হ্রদ। বিশালতার কারণে প্রাচীন চীনা পাণ্ডুলিপিতে এই হ্রদকে ‘উত্তর সাগর’
বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বহুকাল ধরে ইউরোপের মানুষ সাগরসদৃশ এই হ্রদের খবর
জানতো না। রাশিয়া এই অঞ্চলে তাদের রাজ্য সম্প্রসারিত করলে সর্বপ্রথম কুরবাত
ইভনিভ নামক এক রুশ অনুসন্ধানী গবেষক ১৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে এই এলাকায় পৌঁছেন।
তার মাধ্যমে প্রকৃতির অপরূপ বিস্ময় ও সৌন্দর্যের লীলাভূমি বৈকাল হ্রদ এবং
তার পাড় জীব-বৈচিত্র্যের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। হ্রদের পাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা
জুড়ে ১ হাজার ৭০০’রও বেশি জাতের গাছপালা ও জীবজন্তু রয়েছে, যার এক-তৃতীয়াংশ
পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না। এখানে রয়েছে ওমূল, গোলেমিংকা, স্যামন
প্রভৃতি মাছ এবং নানাজাতের শামুক, শ্যাওলা ইত্যাদি। এর পূর্ব পাড়ে বাস করে
বুরিয়াত নামক আদিবাসী সম্প্রদায়। বৈকাল শীতপ্রধান এলাকা। শীতকালে এখানকার
তাপমাত্রা শূন্যের নিচে ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস; আর গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ ১৪
ডিগ্রি সেলসিয়াস। শীতকালে হ্রদের পানি বরফ হয়ে পুরো আস্তরণ তৈরি হয়; তখন
তার ওপর দিয়ে দিব্যি হেঁটে যাওয়া যায়। প্রকৃতির বিস্ময় বৈকাল হ্রদে সারা
পৃথিবীর অনুসন্ধানী গবেষক আর সৌন্দর্যপিপাসু পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে
সারাবছর।





0 comments:
Post a Comment