Powered by Blogger.

Thursday, October 1, 2015

সুন্দরবন ভ্রমনে যেতে চাইলে যে তথ্যগুলো জানা দরকার।

সুন্দরবন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি হিসেবে বিখ্যাত । এটি বাংলাদেশের ৪টি জেলা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিস্তৃত । ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের প্রায় ৬,০০০ বর্গ কিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশ অংশে। সুন্দরবন ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং ১৯৯২ সালে রামসার স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়।সুন্দরবনের বাংলাদেশ ও ভারতীয় অংশ একই  ভূমিরূপের অংশ হলেও ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের সূচিতে ভিন্ন ভিন্ন নামে লিপিবদ্ধ হয়েছে যথাক্রমে সুন্দরবন ও সুন্দরবন জাতীয় পার্ক নামে।

সুন্দরবনে দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা আসেন মুলত পৃথিবী বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ,কুমির, বানর,সাপ এবং শতাধিক প্রজাতির পাখি দেখার আশায়। প্রকৃতির অপরূপ অনাবিল সৌন্দর্যমন্ডিত রহস্যঘেরা এ বনভূমি পর্যটকদের কাছে একারণেই বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমনস্থান।
ভ্রমণ মৌসুম: প্রায় সব মৌসুমেই সুন্দরবনে ভ্রমনপিপাসুদের আনাগোনা থাকলেও শীত মৌসুমে পর্যটকের ভিড় থাকে বেশী।কারণ এই সময় সুন্দরবনের ভিতর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খাল গুলোতে পানি থাকে কম এবং বনভুমির লোনা পানিতে নিমজ্জিত অংশ গুলো শুকিয়ে আসে।যার ফলে বনের মধ্যে ঘুরে দেখার সুযোগ পাওয়া যায় বেশি।আবার কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে রাঁসমেলা নামে পাঁচ দিনের একটি মেলাও বসে দুবলার চরে।এ সময়ও দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখর থাকে সুন্দরবন।
ভ্রমণকালে যা সঙ্গে রাখতে হবে :

ü  আপনার ব্যাগের ভেতরে একটা কাগজে নাম, ঠিকানা ও টেলিফোন নাম্বার লিখে রাখুন।
ü  আপনি কোন কোন জায়গায় যাচ্ছেন তার বিবরণ (Itinerary) সাথে গাইডের কন্টাক্ট নাম্বার, গ্রুপের সাথে গেলে গ্রুপ লিডারের নাম এবং কন্টাক্ট নাম্বার এসব লিখে রেখে যাবেন।
ü  সুন্দরবনে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কের সমস্যা আছে, সুতরাং সেভাবে বাসায় বলে যাবেন।
ü  আপনি যদি কোন ঔষধ নিয়মিত সেবন করেন সেই ঔষধ যতদিন বাইরে থাকবেন তারচাইতে অন্ততঃ দিন দুয়েকের বেশী পরিমান সাথে রাখবেন। সহযাত্রী কাউকে এই ঔষধের ব্যাপারটা জানিয়ে রাখবেন।
ü  জরুরী চিকিৎসা সরঞ্জামাদী যেমন ডেটল, তুলা, ওরস্যালাইন ইত্যাদি।
ü  চশমা ব্যবহার করলে সাথে অতিরিক্ত একটি নেবেন, সানগ্লাস রাখতে পারেন।
ü  যত কম সম্ভব কাপড় চোপড় সাথে নেবেন, উজ্জ্বল রঙ এর কাপড় নেবেননা। টাওয়েল না নিয়ে গামছা রাখতে পারেন, হ্যাট নিতে পারেন।
ü  পানিতে ধোয়া যায় তেমন বুট, এক জোড়া চপ্পল, সানস্ক্রীন লোশন।
ü  ক্যামেরা, মেমরী কার্ড, টর্চলাইট, পাওয়ার ব্যাংক, মাল্টিপ্লাগিং সিস্টেম, দূরবীন।
ü  বাক্স টাইপের ব্যাগ পরিহার করে ঝোলানো যায় তেমন কাপড়ের ব্যাগ।
ü  শীতবস্ত্রের সঙ্গে একটি করে কম্বল

কিভাবে যাবেন :
সুন্দরবন যেতে চাইলে আপনি ঢাকা থেকে সরাসরি চেয়ার কোচে মংলা বন্দরের পর্যটন ঘাটে পৌছাতে পারেন। সেখান থেকে চেয়ার কোচ অথবা ট্রেনে খুলনা গিয়ে কোন আবাসিক হোটেলে রাত যাপন করে পরের দিন খুলনা জেলখানাঘাট থেকে লঞ্চে সুন্দরবনে যেতে পারেন।
অথবা ঢাকা থেকে বাসে সাতক্ষীরা হয়ে শ্যামনগর, সেখান থেকে মাইক্রোতে সুন্দরবনের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন, এখান থেকে অনুমতি সংগ্রহ করে সুন্দরবনে ঢোকা এবং অনেকগুলো পথের একটি বেছে নিয়ে হিরণপয়েন্ট ঘুরে আসা। ঢাকা থেকে বুড়িগোয়ালিনী আসতে যে পরিমান সময় লাগে আর যেভাবে গাড়ি পাল্টাতে হয় তাতে বেশীর ভাগ ট্যূর কোম্পানী এ রাস্তায় আসেনা।

যেভাবে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে হয় :
খুলনা কিংবা মংলা থেকে নৌ পথে সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে প্রবেশ করা যায়। সুন্দরবন ভ্রমনের সবচাইতে জনপ্রিয় রুট হচ্ছে খুলনার কাছে ডিঙ্গামারী ফরেস্ট অফিস থেকে অনুমতি সংগ্রহ করে কটকা, কচুখালী এসব এলাকা ঘুরে বেড়ানো। কটকা কিংবা কচুখালী দুটো জায়গাই সুন্দর। দেশের বড় ট্যূর অপারেটর গুলো সাধারণত এপথই অনুসরণ করে, এর মূল কারন নদীর নাব্যতা।
বনভূমি ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য গাইড নেয়াসহ সেখান থেকে সুন্দরবনে প্রবেশের আনুষাঙ্গিকতা সারতে হয়বন বিভাগের কার্যালয় থেকে । সুন্দরবনে প্রবেশের জন্য ট্রলার বা লঞ্চ ভাড়া করলে তার জন্য আলাদা ফি পরিশোধ করতে হয়।এছাড়াও পর্যটকদের তার সাথে সাথে ভিডিও ক্যামেরা নিতে চাইলে অতিরিক্ত একশ টাকা বন বিভাগকে দিতে হয়।
যা যা দেখবেন :
বনে ঢুকলেই দেখবেন সারি সারি সুন্দরী, পশুর, কেওড়া, গেওয়া এবং গোলপাতা গাছ। দৃষ্টি যতদূর যায় সব খানেই যেন কোন শিল্পী সবুজ অরণ্য তৈরি করে রেখেছেন।অপরূপ চিত্রা হরিণের দল, বন মোরগের ডাক, বানরের চেঁচামেচি, মৌমাছির গুঞ্জন ও বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গর্জন। সুন্দরবন বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও চিত্রা হরিণের জন্য। কিন্তু বর্তমানে সেখানে বানর, কুমির, হাঙ্গর, ডলফিন, অজগর ও বন মোরগ ছাড়াও রয়েছে ৩৩০ প্রজাতির গাছ, ২৭০ প্রজাতির পাখি, ১৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪২ প্রজাতির বন্য প্রাণী ও ৩২ প্রজাতির চিংড়িসহ ২১০ প্রজাতির মাছ।এছাড়াও দেখবেন বাওয়ালীদের গোলপাতা সংগ্রহ আর মৌয়ালীদের মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহের দৃশ্য। সুন্দরবনের এসব নয়নাভিরাম দৃশ্য ও বন্য প্রাণী দেখতে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা প্রতিনিয়ত সেখানে ছুটে যাচ্ছেন।
সুন্দরবনে গেলে অবশ্য করণীয়:
সুন্দরবনের কিছু মনোমুগ্ধকর স্থান রয়েছে যেখানে না গেলে আপনার সুন্দরবন যাওয়া সfর্থক হবে না। এরমধ্যে
·         হিরণ পয়েন্ট
·         দুবলার চর
·         শরণখোলা
·         ছালকাটা
·         টাইগার পয়েন্ট টাওয়ার
·         টাইগার পয়েন্ট সি বিচ
·         জামতলা সি বিচ
·         সাত নদীর মুখ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
সুন্দরবন ভ্রমণে বন্যপ্রানীর দেখা পাওয়া কঠিন কিছু নয়। তবে ভ্রমন শুরুর আগেই  কিছু নিয়মকানুন মেনে চললে এখানে অনেক প্রানীর দেখা পাওয়া সম্ভব।যেমন,
Ø  পাশাপাশি না হেঁটে এক লাইনে চলুন। একা হাঁটবেননা।
Ø  বনে হাটাঁর সময় অহেতুক উচ্চস্বরে কথা না বলে নিরবতা পালন করা
Ø  বনে হাঁটার সুবিধার জন্য কাঁধ সমান উঁচু লাঠি ব্যবহার করুন।
Ø  কেউ কোনো বন্যপ্রানী দেখলে চিৎকার না করে অন্যকে ইশারায় জানানো
Ø  নিজনিজ পানির বোতল সাথে নেয়া
Ø  অজানা গাছের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন, পাতা বা কষ যাতে গায়ে না লাগে খেয়াল রাখুন।
Ø  গাইডের নির্দেশনা মানা
প্রসিদ্ধ খাবার :সুন্দরবনে যেসব পর্যটকেরা আসেন তারা অধিকাংশই এখান প্রসিদ্ধ জিনিসগুলো সাথে করে নিতে চান। এখানকার প্রসিদ্ধ জিনিষের মধ্যে রয়েছে মৌচাকের খাঁটি মধু, নদীর বিভিন্ন প্রজাতির টাটকা মাছ, বাগদা ও গলদা চিংড়ি, কাকড়া ও সামুদ্রিক শুটকি ।

0 comments:

Post a Comment