নৈসর্গিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি পার্বত্য জেলা চট্টগ্রামের
রাঙ্গামাটি । এখানে পাহাড়ের কোল ঘেঁসে ঘুমিয়ে থাকে শান্ত জলের হ্রদ। নদী
বয়ে চলে তার আপন মনে। সীমানার ওপাড়ে নীল আকাশ যেন চুমু খায় নদী আর পাহাড়ের
বুকে। এখানে চলে পাহাড় নদী আর হ্রদের এক অপূর্ব মিলনমেলা। নদীর বাঁকে বাঁকে
বাতাস সুর তোলে আপন মনে। প্রকৃতির এই অপরুপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ নয়নে শুধু
চেয়ে থাকতে হয় অসহায় মানুষ হয়ে। চারপাশ দেখে মনে হয় আঁকা কোন জল রঙের ছবি।
এখানকার প্রতিটি পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অদেখা এক ভূবন যেখান আপনার জন্য
অপেক্ষা করছে নয়নাভিরাম দৃশ্যপট। এখানকার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে কাপ্তাই
হ্রদ ভ্রমন অন্যতম ও অসাধারণ। কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ নির্মাণের ফলে সৃষ্টি
হয় সুবিশাল কাপ্তাই হ্রদ। মূলত পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই বাঁধ নির্মিত
হয়। অসংখ্য পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা আঁকাবাঁকা বিশাল কাপ্তাই হ্রদে
নৌবিহারের অনুভূতি এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এতে করে অনুভূত হবে রোমাঞ্চকর
অনুভূতির । দেশীয় ইঞ্জিন নৌকা,লঞ্চ, স্পিডবোটে চড়ে দিনভর নৌবিহার করা যেতে
পারে। মজার ব্যাপার হলো আপনি চাইলে এই হ্রদ ঘুরতে ঘুরতেই দেখে ফেলতে পারবেন
রাঙ্গামাটির অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলো। হ্রদটি ঘুরে দেখার জন্য আপনার
প্রয়োজন হবে একটি ভাল নৌযানের। রাঙ্গামাটি পর্যটন এলাকা থেকে সারাদিনের
জন্য বোট ভাড়া করলে দু’হাজার থেকে আড়াই হাজার পর্যন্ত টাকা লাগবে। পর্যটন
এলাকায় বোট ভাড়া একটু বেশি। রিজার্ভ বাজার থেকে বোট বা ট্রলার ভাড়া করলে
একটু কম দামে পাওয়া যাবে। এক হাজার থেকে বারশ’র মধ্যে হয়ে যাবে। উপজাতির
বসবাস: পাখির কুহুতান, সবুজের মাখামাখি আর অসংখ্য নৃগোষ্ঠী এই জনপদকে
দিয়েছে ভিন্ন এক রূপ। এখানে প্রায় ১৪টির মতো উপজাতী বসবাস করে। চাকমা,
মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, মুরং, বোম, খুমি, খেয়াং, পাংখোয়া, লুসাই, সুজ
সাওতাল ও রাখাইন অন্যতম। নৃগোষ্ঠীর জীবন-যাপন ও সংগ্রাম আপনাকে যেমন মুগ্ধ
করবে তেমনি মুগ্ধ করবে এর পর্যটন এলাকাগুলো। দর্শনীয় স্থান: রাঙ্গামাটিতে
ভ্রমন করার জন্য রয়েছে অনেকগুলো দর্শনীয় স্থান। এর মধ্যে কাপ্তাই লেক,
পর্যটন মোটেল, ডিসি বাংলো, ঝুলন্ত ব্রিজ, পেদা টিংটিং, সুবলং ঝর্না,
রাজবাড়ি, রাজবন বিহার, উপজাতীয় জাদুঘর, কাপ্তাই হাইড্রো ইলেক্ট্রিক
প্রজেক্ট, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। রাঙ্গামাটির অন্যতম
সুন্দর দর্শনীয় স্থান এটি। চমৎকার একটি জলপ্রপাত এই স্থানকে দিয়েছে ভিন্ন
একটি চরিত্র। রাজবাড়ি: রাঙ্গামাটি শহরেই অবসথিত রাজবাড়ি। চাকমা সার্কেল চিফ
রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় ও তার মা রাণী আরতি রায় এ রাজবাড়িতে থাকতেন।
চারদিকে হ্রদ বেষ্টিত এই রাজবাড়ি পুরনো হলেও দেখতে ও বেড়াতে ভীষন ভাল
লাগে। রাজদরবার, কাচারি, সজ্জিত কামানসহ দেখার মতো অনেক কিছু আছে। রাজবাড়ীর
নিরিবিলি পরিবেশ, সবুজ বাঁশের ঝাড় আর পাখির কলকাকলি আপনাকে মুহুর্তের
জন্য অঁচল করে দেবে। রাজবাড়ীর পাশেই উপজাতীয় নারীরা তাদের হাতে বুনা বস্ত্র
সম্ভার নিয়ে বসে থাকে বিকিকিনির জন্য। এসব পণ্য আপনার প্রয়োজন মেটাতে
পারে। তবে আসল রাজবাড়ী এখনো পানির নীচে। রাজবন বিহার: রাজবাড়ির পাশেই
আন্তর্জাতিক খ্যাত এই বৌদ্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটি অবস্থিত। এখানে অবস্থান
করেন বৌদ্ব আর্য পুরুষ শ্রাবক বুদ্ধু সর্বজন পূজ্য শ্রীমৎ সাধনানন্দ
মহাসহবির বনভান্তে। এই বৌদ্ব বিহারে প্রত্যেক বছর কঠিন চীবর দানোৎসব হয় এবং
এখানে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে। এছাড়া প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থীদের
ভিড়ে মুখরিত থাকে রাজবন বিহার এলাকা। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান বৌদ্ব
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। বেশ কয়েকটি বৌদ্ব মন্দির, বিশ্রামাগার, হাসপাতাল,
সর্বজনীন উপামনা বিহার.বনভান্তে সাধনা কুঠির,বনভান্তে চংক্রমন ঘর ও তাবতিংস
স্বর্গসহ অনেক কিছু রয়েছে দেখার মত। তবলছড়ি চাকমা বাজার: রাঙামাটি শহরে
এটি হলো একটি প্রধান উপজাতীয় বাজার। সপ্তাহে বুধ এবং শনিবার এ বাজার বসে।
উপজাতীয় কিশোর-কিশোরী, নারী এবং পুরুষরা এখানে আসে নানা ধরনের জিনিসপত্র
কিনতে। খাওয়া দাওয়া: রাঙ্গামাটি এসে স্থানীয় আদিবাসীদের খাবার না খেলে পুরো
ভ্রমনটাই অপূর্ণ থেকে যাবে আপনার। তাই ইচ্ছে করলে এবং যদি কপাল ভাল হয় তবে
আপনিও স্বাদ নিতে পারেন আদিবাসীদের হরেক রকম খাবারের। এদের অনেকগুলো পদের
মধ্যে কয়েকটি খাবারের পদ খুবই ভিন্ন প্রকৃতির ও সুস্বাদু। আপনি যে কোন
হেটেলেই এসব খাবার পাবেন না। তাই রাঙামাটি গেলে অবশ্যই আদিবাসিদের খাবার
খাওয়ার জন্য বলব সবাইকে। পর্যটকদের জন্য খুবই দৃষ্টিকাড়া ও আকর্ষনীয় স্থান
রাঙামাটি।পর্যটন এলাকায় অবস্থিত ঝুলন্ত ব্রিজটি পর্যটন এলাকাকে আরও বেশি
সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দিত করেছে। সহজেই পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে এই আকর্ষণীয়
স্থানটি। পর্যটকদের আকর্ষণের কারনে এবং এর নির্মানশৈলির কারনে ঝুলন্ত ব্রিজ
আজ রাঙ্গামাটির নিদর্শন হয়ে দাড়িয়ে আছে।












































